ব্যাখ্যা
• সঠিক উত্তর- ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ পর্বে রচিত বাংলা বইগুলো-
সংস্কৃত বইয়ের অনুবাদ।
• ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ (১৮০০ সালে প্রতিষ্ঠিত) পর্বে (বিশেষত ১৮০১-১৮১৫) বাংলা গদ্যের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে, কিন্তু এই সময়ে রচিত বাংলা গ্রন্থগুলোর অধিকাংশই
সংস্কৃত গ্রন্থের অনুবাদ বা সংস্কৃত সাহিত্যের প্রভাবে রচিত হয়েছে।
উইলিয়াম কেরির নেতৃত্বে দেশীয় পণ্ডিতরা (যেমন, রামরাম বসু, মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার, গোলকনাথ শর্মা) এই কাজ করেন। এই গ্রন্থগুলো কলেজের ইংরেজ কর্মচারীদের জন্য পাঠ্যপুস্তক হিসেবে রচিত হয়েছে, যাতে সংস্কৃতের কৃত্রিম গাম্ভীর্য এবং সাধু ভাষার প্রাধান্য লক্ষণীয়।
উদাহরণস্বরূপ:
• হিতোপদেশ (গোলকনাথ শর্মা, ১৮০২; মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার, ১৮০৮): সংস্কৃত গ্রন্থের অনুবাদ।
• বত্রিশ সিংহাসন (মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার, ১৮০২): সংস্কৃত কথাসাহিত্যের অনুবাদ।
• রাজাবলি (মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার, ১৮০৮): সংস্কৃত ইতিহাসের অনুবাদ।
• রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র (রামরাম বসু, ১৮০১): এটি বাংলা গদ্যের প্রথম মুদ্রিত জীবনচরিত্র, কিন্তু সংস্কৃত শৈলীতে রচিত এবং ঐতিহাসিক উৎসের ভিত্তিতে (মৌলিক বলে বিবেচিত হলেও, সংস্কৃত প্রভাব প্রধান)।
যদিও কিছু গ্রন্থে পণ্ডিতদের নিজস্ব শৈলী প্রকাশ পেয়েছে (যেমন, কথোপকথন বা লিপিমালা), তবুও অধিকাংশই অনুবাদভিত্তিক। এই পর্ব বাংলা গদ্যকে সংস্কৃতীকরণ করেছে, যা পরবর্তীকালে চলিত ভাষার প্রসারে সাহায্য করেছে।
অন্যান্য অপশনগুলো কেন সঠিক নয় তা বিশ্লেষণ করা হলো:
খ) ফারসি বইয়ের অনুবাদ: ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে ফারসি ভাষার শিক্ষা দেওয়া হলেও বাংলা গদ্যপুস্তকগুলো ফারসি গ্রন্থের অনুবাদ ছিল না। এগুলো মূলত সংস্কৃত গ্রন্থের ভিত্তিতে রচিত হয়।
গ) ইংরেজি বইয়ের অনুবাদ: এই পর্বে বাংলা গদ্যে ইংরেজি গ্রন্থের অনুবাদের উদাহরণ তেমন পাওয়া যায় না। বাংলা গদ্যের প্রাথমিক বিকাশে সংস্কৃত প্রভাবই প্রধান ছিল।
ঘ) পণ্ডিতদের রচিত মৌলিক গ্রন্থ: যদিও কিছু গ্রন্থে পণ্ডিতদের নিজস্ব রচনাশৈলী প্রকাশ পেয়েছে (যেমন, উইলিয়াম কেরির কথোপকথন বা রামরাম বসুর রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র), তবুও এই গ্রন্থগুলোর অধিকাংশই সংস্কৃত গ্রন্থের অনুবাদ বা সংস্কৃত সাহিত্যের প্রভাবে রচিত। তাই এটিকে সম্পূর্ণ মৌলিক গ্রন্থ বলা যায় না।
•
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ:
বাংলাদেশে কর্মরত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ইংরেজ কর্মচারীদের দেশীয় ভাষায় শিক্ষাদানের জন্য তৎকালীন ইংরেজশাসিত ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড ওয়েলেসলি কর্তৃক ১৮০০ সালে কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। ৪ঠা মে কলেজের প্রতিষ্ঠা-দিবস হলেও ২৪শে নভেম্বর থেকে কলেজের কাজ শুরু হয়েছিল। ওয়েলেসলি অনুভব করেছিলেন যে কোম্পানির দায়িত্বপূর্ণ কাজের ভার নিয়ে বিলাত থেকে যারা আসে, তারা অধিকাংশ চৌদ্দ থেকে আঠার বৎসরের নাবালক, স্বদেশে তাদের শিক্ষা সম্পূর্ণ হয় নি, এ দেশেও তার কোন ব্যবস্থা ছিল না। দেশীয় ভাষা শিক্ষা দিয়ে এই সিবিলিয়ানদের উপযুক্ত করে তোলার জন্যই ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের প্রতিষ্ঠা। এই কলেজে ১৮০১ সালে বাংলা বিভাগ প্রবর্তিত হলে অধ্যক্ষ হিসেবে আসেন শ্রীরামপুর মিশনের পাদ্রি এবং বাইবেলের অনুবাদক বাংলায় অভিজ্ঞ উইলিয়াম কেরি। তিনি তাঁর অধীনস্ত দু জন পণ্ডিত এবং ছয় জন সহকারী পণ্ডিতের সহযোগিতায় বাংলা গদ্যে কলেজের পাঠোপযোগী পুস্তক রচনায় আত্মনিয়োগ করেন। তাঁদের প্রচেষ্টার ফলাফল দিয়েই বাংলা গদ্যের অনুশীলনে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের ভূমিকা নিরূপণ করা হয়।
ফোর্ট উইলিয়ামের পর্বে ১৮০১ থেকে ১৮১৫ সালের এই সময়ের মধ্যে ৮ জন লেখক ১৩ খানি বাংলা গদ্যপুস্তক লিখেছিলেন:
• কেরি রচিত- কথোপকথন (১৮০১)।
• রামরাম বসু রচিত- ইতিহাসমালা (১৮১২), রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র (১৮০১), লিপিমালা (১৮০২)।
• গোলোকনাথ শর্মা রচিত- হিতোপদেশ (১৮০২)।
• মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার রচিত- বত্রিশ সিংহাসন (১৮০২), হিতোপদেশ (১৮০৮), রাজাবলি (১৮০৮), প্রবোধচন্দ্রিকা (১৮৩৩)।
• তারিণীচরণ মিত্র রচিত- ওরিয়েন্টাল ফেবুলিস্ট (১৮০৩)।
• রাজীবলোচন মুখোপাধ্যায় রচিত- মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায়স্য চরিত্রং (১৮০৫)।
• চণ্ডীচরণ মুর্শী রচিত- তোতা ইতিহাস (১৮০৫)।
• হরপ্রসাদ রায় রচিত- পুরুষ পরীক্ষা (১৮১৫)।
উল্লেখ্য,
বাংলা ভাষার সংস্কৃতীকরণ বাংলা গদ্যের সূচনাতেই এর রূপের পরিবর্তন ঘটেছিল। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজকে কেন্দ্র করে যে লেখকগোষ্ঠী গদ্যরচনায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন তাঁরাই বাংলা গদ্যকে সংস্কৃতঘেঁষা করে তোলেন। এতদিন পর্যন্ত দৈনন্দিন জীবনের কথাবার্তায় তদ্ভব, আরবি-ফারসি ও দেশজ শব্দমিশ্রিত যে ভাষা প্রচলিত ছিল তা সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিতগণের প্রভাবে সংস্কৃত শব্দসম্ভারে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে এবং গদ্যরীতির মধ্যে কৃত্রিম গাম্ভীর্য আনীত হয়। এমনিভাবে বাংলা গদ্য একটা নতুন রূপ পরিগ্রহ করে।
উৎস: বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, ড মাহাবুবুল আলম এবং বাংলাপিডিয়া।